তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য উন্মোচিত হবে নতুন দিগন্ত

তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য উন্মোচিত হবে নতুন দিগন্ত

রাজশাহী শহরের উপকণ্ঠে পদ্মাপারে ৩১ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠছে এ অঞ্চলের তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ইকোনমিক হাব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্ক রাজশাহী। নগরীর বুলনপুর এলাকায় ২৮১ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির আদলে তৈরি করা হচ্ছে এ পার্কের অবকাঠামো।ইতোমধ্যে ৬২ হাজার বর্গফুট আয়তনের পাঁচতলাবিশিষ্ট শেখ কামাল আইটি ইনকিউবেটর কাম ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। যেখানে জায়গা পেয়েছে এ অঞ্চলের তরুণ উদ্যোক্তাদের ১০টি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। রাজশাহী ঘুরে এসে বাংলাদেশের সিলিকন ভ্যালি তথা বঙ্গবন্ধু হাই-টেক পার্ক নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন সাইফ আহমাদ  |শিক্ষা নগরী রাজশাহীর নবীনগর মৌজায় ২০১৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা ও নতুন তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার লক্ষ্যে পদ্মাপারে মনোরম পরিবেশে এ হাই-টেক পার্কটি গড়ে তোলা হচ্ছে। আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়।

শেখ কামাল আইটি ইনকিউবেশন সেন্টার – রাজশাহীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্কে গড়ে উঠেছে শেখ কামাল আইটি ইনকিউবেশন কাম ট্রেনিং সেন্টার। প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭২ হাজার বর্গফুটবিশিষ্ট এ ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ১৮ জুলাই। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের তিন বছরের মধ্যে এ ইনকিউবেশন ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইটি ইনকিউবেশন কাম ট্রেনিং সেন্টারটির উদ্বোধন করেন। এ ভবনে স্টার্ট-আপদের জন্য বিনামূল্যে স্পেস রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যেই সেখানে জায়গা পেয়েছে ১০টি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে রয়েছে বরেণ্য ফ্রিল্যান্সার রাজশাহীর সন্তান খায়রুল আলমের ফ্লিট বাংলাদেশ।ইনকিউবেশন কাম ট্রেনিং সেন্টার নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একান্ত সচিব ও ওয়ানস্টপ সার্ভিসের প্রধান সমন্বয়কারী কল্যাণ কুমার সরকারের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমরা এখানে মূলত ট্রেইনিং এবং ইনকিউবেশনের ব্যবস্থা করেছি। যেভাবে একটি ডিমকে তা দিয়ে বাচ্ছা বের করে সেই বাচ্চাটাকে নারিশ করে বড় করা হয়, ঠিক একইভাবে নতুন উদ্যোক্তাদের এখানে জায়গা দেয়া হবে এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ওয়ার্কফোর্স তৈরিতে সহযোগিতা করা হবে। যাতে তারা তাদের উদ্ভাবনী আইডিয়াগুলোর পরিস্ফুটন এখান থেকেই করতে পারে।এ ইনকিউবেশন সেন্টারে উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় পরিধি বৃদ্ধি করতে যে ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন তার সব সহযোগিতা করা হবে এবং তারা যখন ব্যবসার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হবে আমরা তাদের হাই-টেক পার্কে নিয়ে যাব এবং তারা সেখানে নিজেরা স্পেস নেবে নিজেদের মতো ব্যবসা করবে।এ ইনকিউবেশন সেন্টারে কতজন উদ্যোক্তা একই সময়ে প্রশিক্ষণ পাবেন এবং তাদের আর কী কী সুবিধা দেয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে কল্যাণ সরকার বলেন, আমরা প্রথমবারে ১০ জন উদ্যোক্তা নিয়ে আসব। এই দশ উদ্যোক্তার জন্য সব কিছু ফ্রি থাকবে যেমন- চেয়ার, টেবিল, ফার্নিচার, ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ। এসব ছাড়াও কোনো উদ্যোক্তার যদি ব্যবসার জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা প্রয়োজন হয়, সে ক্ষেত্রে আমরা তদের ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেই সুবিধা পেতেও সহযোগিতা করব।রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যলয়ের (রুয়েট) ইলেক্ট্রিক অ্যান্ড কম্পিউটার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসনিম বিনতে শওকত বলেন, বিশ্ব যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদেরও এখানে আরও বেশি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং এ খাতের সম্প্রসারণ প্রয়োজন।আমরা এমন এক সময়ে এসেছি যখন প্রযুক্তি ছাড়া আসলে আমাদের শিল্প এবং অর্থনীতি উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাজশাহীতে যেহেতু অনেক প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেহেতু এখানকার শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের জন্য এ হাই-টেক পার্ক ভূমিকা রাখবে।আমাদের ইকোনমির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে কৃষি, এ খাতে প্রযুক্তির মাধ্যমে কিভাবে আরও সক্ষমতা বাড়ানো যায় সেদিকে তরুণ নজর দেয়ার কথাও জানান তিনি। হাইটেক পার্ক এ লক্ষ্যে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এমনকি গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমেও অবদান রাখতে পারে বলে যোগ করেন তাসনিম বিনতে শওকত।

জয় সিলিকন টাওয়ার – রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট, রাজশাহী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, রাজশাহী মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় লক্ষাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের কথা বিবেচনা করেই মূলত এ অঞ্চলে গড়ে তোলা হচ্ছে হাই-টেক পার্ক।পার্কের একটি বড় অংশজুড়ে নির্মিত হচ্ছে দুই লাখ বর্গফুটের ১০ তলাবিশিষ্ট জয় সিলিকন টাওয়ার। এখানে স্থান পাবে তরুণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে এ সিলিকন টাওয়ারের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। যেখানে ২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।রাজশাহী সিটিতে নির্মিতব্য বঙ্গবন্ধু হাই-টেক পার্ক নিয়ে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, রাজশাহীতে হাই-টেক পার্ক অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি বলেন, রাজশাহীতে অন্য কোনো ক্ষেত্রে শিল্পায়ন হয়নি। ফলে এখানে কর্মসংস্থানের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলেই তার নির্দেশে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক রাজশাহী শহরের এক প্রান্তে এ হাই-টেক পার্ক নির্মাণ কাজের পরিকল্পনা জানান।যেহেতু এখানে তেমন কলকারখানা নেই সেহেতু এখানকার নতুন গ্র্যাজুয়েটদের আমরা বিশেষ কোনো চাকরির ব্যবস্থা করতে পারছি না তাছাড়া এখানকার ছেলেমেয়েরা বাইরে গিয়েও কাজ করতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তারা চায় অল্প উপার্জন হলেও নিজের এলাকায় থেকে জীবিকা নির্বাহ করতে। সে ক্ষেত্রে এ হাই-টেক পার্ক থেকে এখানকার তরুণ-তরুণীরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন।

এখানে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এখন থেকে আর চাকরির পেছনে ছুটতে হবে না, নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে মানুষকে চাকরি দেবেন। উদাহরণ দিতে গিয়ে মেয়র বলেন, আমি এমন পরিবার চিনি স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই ফ্রিল্যান্সিং করেন। তাদের মধ্যে একজনকে দেখেছি নদির ধারে ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবহার করে ল্যাপটপে কাজ করতে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে আমাদের জাতীয় আয়ের সিংহভাগ এ তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে। আমরা সিটি কর্পোরেশনের জন্যও সেখানে একটি ফ্লোর বরাদ্দ পেয়েছি, যাতে সেখান থেকেও নাগরিকদের আমরা বিভিন্ন সেবা দিতে পারি।

এখানে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে আমরা রাস্তা ফোর লেইন করছি, এমনকি রাজশাহী বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিকমানের করার প্রস্তাবনাও দিয়েছি। সেটা হয়তো শিগগিরই হয়ে যাবে বলে উল্লেখ করেন এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন।ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহর রাজশাহীতেও আন্তর্জাতিকমানের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে রাজশাহী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্ক গড়ে উঠছে। এখানে কর্মসংস্থানের বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, পুরোপুরি চালু হলে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ১৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।এ অঞ্চলের তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য উন্মোচিত হবে নতুন দিগন্ত। দুই লাখ বর্গফুটের জয় সিলিকন টাওয়ারসহ ৭টি প্লটে বিভিন্ন বিনিয়োগকারীর অনুকূলে বরাদ্দ প্রদানের সংস্থান রয়েছে। সম্প্রতি স্টার্টআপ প্রতিযোগিতার জন্য বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর পত্র প্রেরণ করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র : যুগান্তর

তথ্য ও প্রযুক্তি